১৬ মে ২০২৬, শনিবার হালিশহর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে লেখালেখি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা–২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়।পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, অধ্যক্ষের উদ্বোধনী বক্তব্য এবং ম্যাগাজিন কমিটির আহ্বায়কের বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই কর্মশালায় কলাম, সম্পাদনা, চিঠি ও ফিচার রচনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়।কর্মশালার প্রতিটি সেশন ছিল জ্ঞানবর্ধক, অংশগ্রহণমূলক এবং নবীন লেখকদের দক্ষতা উন্নয়নে অত্যন্ত কার্যকর।
প্রথম সেশনে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, চট্টগ্রামের সভাপতি ইসমাইল হোসেন ইমন। “কলাম লেখার আদ্যোপান্ত” শীর্ষক আলোচনায় তিনি কলাম লেখার উদ্দেশ্য, গঠনপ্রণালি ও সফল উপস্থাপনার ধাপসমূহ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি কার্যকর কলাম রচনার প্রথম ধাপ হলো যথাযথ বিষয় নির্ধারণ। এরপর পুরো লেখার মূল ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আকর্ষণীয় শিরোনাম নির্বাচন করতে হবে। ১০০-১৫০ শব্দের সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রভাববিস্তারকারী ভূমিকার মাধ্যমে পাঠককে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করাতে হবে। পরবর্তী অংশে সমস্যার কারণ বিশ্লেষণ, বিষয়ভিত্তিক আলোচনা এবং সমস্যাজনিত প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য সমাধান ১৫০-২০০ শব্দের সুশৃঙ্খল অনুচ্ছেদে উপস্থাপন করার পরামর্শ দেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি কলামের বৈশিষ্ট্য হিসেবে সহজ-প্রাঞ্জল ভাষা, অনুচ্ছেদসমূহের সার্থক সংযোগ, নির্ভুল বানান, নান্দনিক ভাষাশৈলী, শক্তিশালী যুক্তি এবং মূল বিষয়ের সাবলীল উপস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি নবীন ক্ষুদে লেখকদের নিয়মিত পত্রিকা, বই ও কলাম পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং কুম্ভীলকবৃত্তি, তথ্যসূত্রহীন লেখা ও ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রবিরোধী আক্রমণাত্মক লেখালেখি থেকে বিরত থাকার পরামর্শ প্রদান করেন।
দ্বিতীয় সেশনে বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও কলামিস্ট মোনেম শাহরিয়ার শাওন “সম্পাদনায় ভাবনার শুদ্ধ স্বর” শীর্ষক আলোচনা উপস্থাপন করেন। চমকপ্রদ প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শুরু হওয়া তাঁর সেশনটি লেখকের আত্ম-সচেতনতা, চিন্তার স্বাতন্ত্র্য এবং লেখার নির্ভুলতার গুরুত্বকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। তিনি লেখালেখির প্রথম শর্ত হিসেবে শুদ্ধতা, সঙ্গতি, ব্যাকরণগত শুদ্ধি, বানানের নির্ভুলতা এবং ভাষার প্রাঞ্জলতার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, গাম্ভীর্যপূর্ণ ও দুর্বোধ্য ভাষা নয়; বরং সহজ, প্রাঞ্জল, শক্তিশালী শব্দচয়ন এবং যথাযথ বাক্যগঠনই পাঠকের কাছে লেখাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তিনি সামাজিক, পরিবেশগত, জাতীয় ও রাজনৈতিক নানা প্রাসঙ্গিক বিষয়ে চিন্তা ও লেখার গুরুত্ব তুলে ধরেন। একইসঙ্গে লেখাকে নির্ভুল ও পরিশীলিত করতে বারবার পাঠ, সম্পাদনা, প্রযুক্তিনির্ভর শুদ্ধাচার এবং সঠিক রেফারেন্স ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন।
তৃতীয় সেশনে কলামিস্ট ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কারিশমা ইরিন অ্যামি “চিঠি ও ফিচার লেখার কৌশল” বিষয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা করেন। প্রশ্নোত্তর পর্বের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সেশনে তিনি লেখালেখির গুরুত্ব, সম্পাদকীয় চিঠি ও ফিচারের মৌলিক পার্থক্য, ফিচারের কাঠামো, বিষয় নির্বাচন, ভাষাশৈলী, অনুসরণীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন। উদাহরণনির্ভর ব্যাখ্যার মাধ্যমে তিনি দেখান কীভাবে সময়োপযোগী, পাঠকবান্ধব ও প্রকাশযোগ্য লেখা তৈরি করা যায়। পাশাপাশি পত্রিকায় ইমেইল করে লেখা পাঠানোর নিয়ম, লেখা প্রকাশ না হওয়ার সম্ভাব্য কারণ এবং নিজের লেখাকে আরও গ্রহণযোগ্য করার কৌশল সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। সেশনের শেষাংশে ফিচার, কলাম ও চিঠি বিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে তিনি অংশগ্রহণকারীদের বাস্তবভিত্তিক জিজ্ঞাসার সমাধান করেন।
সমগ্র কর্মশালাটি নবীন ও আগ্রহী ক্ষুদে লেখকদের জন্য ছিল এক অনন্য শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা। তিনজন বক্তার গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন আলোচনা, বাস্তব উদাহরণ ও কার্যকর নির্দেশনা অংশগ্রহণকারীদের লেখালেখির প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে এবং সৃজনশীল, দায়িত্বশীল ও মানসম্মত লেখক হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার পথে অনুপ্রাণিত করে। এই কর্মশালা নিঃসন্দেহে লেখালেখির জগতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।